ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি শিল্প খাতের ধাতু, সার ও কৃষিপণ্যের দাম এপ্রিলে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে গত এপ্রিলজুড়ে বিশ্ববাজার এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
জ্বালানি তেলের বাজারে এ অস্থিরতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এপ্রিলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এটি টানা চতুর্থ মাসের মতো মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এর বিপরীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ৮ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক অগ্রগতির আশায় এ দাম কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ধাতুর দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নিকেলের দাম। ইন্দোনেশিয়া আকরিক নিকেলের দাম বাড়িয়ে দেয়ায় বিশ্ববাজারে এর দাম ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে তামার দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ব্যাটারি তৈরিতে তামার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এর চাহিদা এখন তুঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে অ্যালুমিনিয়াম কারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে এ ধাতুর দামও ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া দস্তা ও সিসার দামও এপ্রিলে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
এদিকে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের দামও বেশ চড়া। সারের উচ্চমূল্য ও খরার আশঙ্কায় গমের দাম প্রতি বুশেলে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। অনেক দেশে গমের আবাদ কম হওয়ায় ভবিষ্যতে এর সরবরাহ আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এর প্রভাবে ভুট্টা ও সয়াবিনের দামও বেড়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭ ও ২ দশমিক ১ শতাংশ। তবে চালের বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। মজুদ বৃদ্ধি ও চাহিদা কম থাকায় চালের দাম ৫ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি ব্রাজিলে বাম্পার ফলনের পূর্বাভাসে কফির দামও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে তুলার দাম এপ্রিলে রেকর্ড ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র খরা ও তুষারপাতের কারণে তুলা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দাম এত বেশি বেড়েছে। সারের সংকট ও এল নিনোর প্রভাবে কোকো বা চকোলেটের কাঁচামালের দামও ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
মূল্যবান ধাতুর বাজারেও দেখা গেছে মিশ্র প্রবণতা। মার্কিন ডলার শক্তিশালী হওয়ায় স্বর্ণ ও রুপার দাম কিছুটা কমলেও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তিতে ব্যবহারের চাহিদা থাকায় প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশ্ববাজারে পণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি ততটাই নাজুক হবে। ফলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোয় পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্যদ্রব্যের ওপর, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী দিনগুলোয় বিশ্ব অর্থনীতি আরো বড় সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।